অনেকে মনে করেন লিভার রোগ শুধু মদ্যপায়ীদের হয়। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বাংলাদেশে যেখানে মদ্যপান তুলনামূলক কম, সেখানেও লিভার রোগীর সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। কারণ অ্যালকোহল ছাড়াও অনেক কারণে লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
লিভার কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
লিভার আমাদের শরীরের সবচেয়ে পরিশ্রমী অঙ্গ। এটি প্রতিদিন রক্ত পরিশোধন, হজমে সাহায্য এবং শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করার কাজ করে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ধীরে ধীরে লিভার তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
অ্যালকোহল ছাড়া লিভার ক্ষতির কারণগুলো
১. ফ্যাটি লিভার বা NAFLD (বর্তমানে MAFLD)
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা NAFLD বাংলাদেশে লিভার রোগের সবচেয়ে বড় কারণ। অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে লিভারে চর্বি জমে। চিকিৎসা না করলে এটি লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে।
২. হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস
হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস লিভারের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত। এই ভাইরাস রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায় — মদ্যপানের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
৩. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অনেকে জানেন না যে সাধারণ ওষুধও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। বিশেষত:
- প্যারাসিটামল — বেশি মাত্রায় বা দীর্ঘদিন খেলে লিভার ফেইলিউর হতে পারে
- ব্যথার ওষুধ বা NSAIDs — দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- যক্ষ্মার ওষুধ — লিভারে প্রভাব ফেলতে পারে
- কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও হার্টের ওষুধ
- কবিরাজি ও হার্বাল ওষুধ — অনেক উপাদান লিভারের জন্য বিষাক্ত
৪. ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
ডায়াবেটিস রোগীদের লিভার রোগের ঝুঁকি অনেক বেশি। রক্তে শর্করার সমস্যা থাকলে লিভারে চর্বি জমার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে লিভার ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
৫. অটোইমিউন হেপাটাইটিস
কখনো কখনো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলক্রমে লিভারের কোষকে আক্রমণ করে — এটিকে অটোইমিউন হেপাটাইটিস বলে। এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে এবং অ্যালকোহলের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
৬. অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা
অতিরিক্ত ওজন, বিশেষত পেটে চর্বি জমলে লিভারে সরাসরি প্রভাব পড়ে। স্থূল ব্যক্তিদের ফ্যাটি লিভার ও লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি স্বাভাবিক ওজনের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।
৭. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খেলে লিভারে চর্বি জমে। এছাড়া দূষিত পানি ও খাবার থেকে হেপাটাইটিস এ ছড়াতে পারে যা লিভারকে আক্রমণ করে।
৮. বংশগত কারণ
কিছু লিভার রোগ বংশগত। যেমন Wilson’s Disease এ শরীরে অতিরিক্ত তামা জমে লিভার নষ্ট হয়। Hemochromatosis এ অতিরিক্ত আয়রন জমে লিভারের ক্ষতি করে। এগুলো সম্পূর্ণ জন্মগত এবং অ্যালকোহলের সাথে সম্পর্কহীন।
৯. থাইরয়েড সমস্যা
থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয় এবং লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ে। হাইপোথাইরয়েডিজম রোগীদের লিভার রোগের ঝুঁকি বেশি।
লিভার ক্ষতির লক্ষণ কী কী?
লিভার রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে রোগ বাড়লে যা দেখা দিতে পারে:
- চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস
- পেটের ডান দিকে উপরে ব্যথা বা অস্বস্তি
- সহজেই ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করা
- পেট বা পা ফুলে যাওয়া
- খাবারে অরুচি ও ওজন কমে যাওয়া
- রক্ত পরীক্ষায় SGPT বা SGOT বেশি আসা
লিভার সুরক্ষায় করণীয়
- হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন নিন — এটি সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দীর্ঘদিন খাবেন না
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং নিয়মিত ব্যায়াম করুন
- ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা নিন
- স্বাস্থ্যকর খাবার খান — শাকসবজি, মাছ ও ফলমূল বেশি খান
- বছরে একবার লিভার ফাংশন টেস্ট ও আলট্রাসাউন্ড করুন
- কবিরাজি ও হার্বাল ওষুধ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:
- চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেছে
- রক্ত পরীক্ষায় লিভার এনজাইম বেশি আসছে
- আলট্রাসাউন্ডে লিভারে সমস্যা ধরা পড়েছে
- পেট বা পা ফুলে যাচ্ছে
- দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি ও দুর্বলতা আছে
মনে রাখবেন — লিভার রোগ শুধু মদ্যপায়ীদের নয়। যে কেউ যেকোনো বয়সে লিভার রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই সচেতন থাকুন এবং নিয়মিত লিভার পরীক্ষা করুন। লিভারের যেকোনো সমস্যায় ডা. দেবপ্রসাদ অধিকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।