
হেপাটাইটিস সি একটি নীরব ঘাতক — কারণ এই রোগ বছরের পর বছর শরীরে থেকে লিভার নষ্ট করতে পারে, অথচ কোনো লক্ষণ দেখা দেয় না। বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ হেপাটাইটিস সি তে আক্রান্ত, কিন্তু বেশিরভাগই জানেন না। সুখবর হলো — হেপাটাইটিস সি এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
হেপাটাইটিস সি কী?
হেপাটাইটিস সি হলো HCV বা Hepatitis C Virus দ্বারা সৃষ্ট একটি লিভার রোগ। এই ভাইরাস লিভারে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং চিকিৎসা না নিলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে।
হেপাটাইটিস সি দুই ধরনের — তীব্র বা Acute এবং দীর্ঘমেয়াদী বা Chronic। প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ আক্রান্ত ব্যক্তি Chronic হেপাটাইটিস সি তে পরিণত হন। এটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
হেপাটাইটিস সি কীভাবে ছড়ায়?
হেপাটাইটিস সি ভাইরাস মূলত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। প্রধান কারণগুলো হলো:
- একই সুই বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে — এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ
- আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করলে
- অপরিষ্কার যন্ত্রপাতি দিয়ে ট্যাটু, কান ফোঁড়ানো বা নাপিতের কাজ
- আক্রান্ত ব্যক্তির রেজার বা টুথব্রাশ ব্যবহার করলে
- অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে — তবে এটি কম সাধারণ
- আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে শিশুর মধ্যে — তবে হেপাটাইটিস বি এর চেয়ে কম
গুরুত্বপূর্ণ: হেপাটাইটিস সি একসাথে খাওয়া, কাশি, হাঁচি, আলিঙ্গন বা হাত মেলানোর মাধ্যমে ছড়ায় না।
হেপাটাইটিস সি এর লক্ষণ কী কী?
হেপাটাইটিস সি কে নীরব ঘাতক বলা হয় কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে লক্ষণ দেখা দিলে যা হতে পারে:
- অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
- পেটের ডান দিকে উপরে ব্যথা বা অস্বস্তি
- বমি বমি ভাব ও খাবারে অরুচি
- জন্ডিস — চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
- গাঢ় হলুদ রঙের প্রস্রাব
- গিরায় গিরায় ব্যথা ও জ্বর
- ওজন কমে যাওয়া
সতর্ক সংকেত: পেট বা পা ফুলে গেলে, রক্ত বমি হলে বা মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দিলে এটি জরুরি অবস্থা — সাথে সাথে হাসপাতালে যান।
হেপাটাইটিস সি কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
হেপাটাইটিস সি নির্ণয়ের জন্য নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়:
- Anti-HCV পরীক্ষা — এটি পজিটিভ হলে হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের সম্ভাবনা আছে
- HCV RNA পরীক্ষা — রক্তে ভাইরাস আছে কিনা এবং কতটুকু আছে তা নিশ্চিত করে
- HCV Genotype পরীক্ষা — ভাইরাসের ধরন জানা যায় যা চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ
- লিভার ফাংশন টেস্ট বা LFT — লিভারের অবস্থা জানা যায়
- Fibroscan বা লিভার বায়োপসি — লিভারে কতটা ক্ষতি হয়েছে তা জানা যায়
হেপাটাইটিস সি এর চিকিৎসা
হেপাটাইটিস সি সম্পর্কে সবচেয়ে বড় সুখবর হলো — এটি এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
আধুনিক DAA বা Direct Acting Antiviral ওষুধ দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের চিকিৎসায় ৯৫ শতাংশেরও বেশি রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান। এই ওষুধ এখন বাংলাদেশেও পাওয়া যায় এবং আগের চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী।
তবে মনে রাখবেন — হেপাটাইটিস সি এর চিকিৎসা অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে নিতে হবে।
হেপাটাইটিস সি প্রতিরোধের উপায়
হেপাটাইটিস বি এর মতো হেপাটাইটিস সি এর কোনো ভ্যাকসিন নেই। তাই সতর্কতাই একমাত্র প্রতিরোধ।
- একই সুই বা সিরিঞ্জ কখনো একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করবেন না
- রক্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই HCV পরীক্ষা করুন
- রেজার, টুথব্রাশ ও নেইল কাটার অন্যের সাথে শেয়ার করবেন না
- ট্যাটু বা কান ফোঁড়ানোর সময় নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার নিশ্চিত করুন
- নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করুন — বিশেষত যদি ঝুঁকিতে থাকেন
কাদের হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা করানো উচিত?
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে থাকলে অবশ্যই Anti-HCV পরীক্ষা করান:
- কখনো রক্ত গ্রহণ করেছেন
- অস্ত্রোপচার বা ডায়ালাইসিস করিয়েছেন
- পরিবারে কারো হেপাটাইটিস সি আছে
- দীর্ঘদিন ধরে অব্যক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করছেন
- লিভার ফাংশন টেস্টে অস্বাভাবিক ফলাফল এসেছে
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
হেপাটাইটিস সি নীরব রোগ — তাই অপেক্ষা করবেন না। উপরের যেকোনো ঝুঁকি থাকলে বা লক্ষণ দেখা দিলে আজই একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
মনে রাখবেন — হেপাটাইটিস সি এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার থেকে সম্পূর্ণ বাঁচা সম্ভব। পরামর্শের জন্য ডা. দেবপ্রসাদ অধিকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।