লিভার সিরোসিস একটি মারাত্মক রোগ যেখানে লিভারের সুস্থ কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শক্ত আঁশযুক্ত টিস্যুতে পরিণত হয়। এই রোগ একবার হলে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয় — তবে সঠিক সময়ে ধরা পড়লে এবং নিয়মিত চিকিৎসা নিলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।
লিভার সিরোসিস কী?
লিভার সিরোসিস হলো লিভারের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির চূড়ান্ত পরিণতি। যখন লিভার বারবার আঘাত পায় — যেমন হেপাটাইটিস, ফ্যাটি লিভার বা অন্য কোনো কারণে — তখন লিভার নিজেকে মেরামত করতে গিয়ে আঁশযুক্ত টিস্যু তৈরি করে। এই আঁশ জমতে জমতে একসময় লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
লিভার আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ — রক্ত পরিশোধন, হজম, রোগ প্রতিরোধ সহ ৫০০-এরও বেশি কাজ করে। তাই লিভার সিরোসিস হলে সারা শরীরে এর প্রভাব পড়ে।
লিভার সিরোসিস কেন হয়?
বাংলাদেশে লিভার সিরোসিসের প্রধান কারণগুলো হলো:
- দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ — বাংলাদেশে এটিই সবচেয়ে বড় কারণ
- দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ
- নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা NAFLD
- দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মদ্যপান
- অটোইমিউন হেপাটাইটিস
- দীর্ঘমেয়াদী কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
লিভার সিরোসিসের লক্ষণ কী কী?
লিভার সিরোসিসের লক্ষণ দুটি পর্যায়ে দেখা যায়।
প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণ
এই পর্যায়ে লক্ষণ খুব কম থাকে তাই অনেকে বুঝতে পারেন না:
- সহজেই ক্লান্তি আসা ও দুর্বলতা অনুভব করা
- খাবারে অরুচি ও ওজন কমে যাওয়া
- পেটের ডান দিকে উপরে হালকা অস্বস্তি
- বমি বমি ভাব
- রক্ত পরীক্ষায় লিভার এনজাইম বেশি আসা
উন্নত পর্যায়ের লক্ষণ
রোগ বাড়লে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
- জন্ডিস — চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
- পেট ফুলে যাওয়া — পেটে পানি জমা বা Ascites
- পা ও পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া
- রক্ত বমি বা কালো পায়খানা — এটি জরুরি অবস্থা
- চামড়ায় চুলকানি
- হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া
- পুরুষদের বুকে স্তন বড় হয়ে যাওয়া
- মানসিক বিভ্রান্তি ও ঘুমের সমস্যা — এটি Hepatic Encephalopathy এর লক্ষণ
সতর্ক সংকেত: রক্ত বমি, কালো পায়খানা বা হঠাৎ মানসিক বিভ্রান্তি হলে এটি জরুরি অবস্থা — সাথে সাথে হাসপাতালে যান।
লিভার সিরোসিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
লিভার সিরোসিস নির্ণয়ের জন্য নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়:
- লিভার ফাংশন টেস্ট বা LFT — লিভারের কার্যক্ষমতা যাচাই
- আলট্রাসাউন্ড — লিভারের আকার ও গঠন দেখা
- Fibroscan — লিভারে কতটা আঁশ জমেছে তা পরিমাপ
- Endoscopy — পাকস্থলী ও খাদ্যনালীতে রক্তনালী ফুলে আছে কিনা দেখা
- লিভার বায়োপসি — নিশ্চিত নির্ণয়ের জন্য
লিভার সিরোসিসের চিকিৎসা ও করণীয়
লিভার সিরোসিস সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়, তবে সঠিক চিকিৎসায় রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
চিকিৎসা
- কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা — হেপাটাইটিস বি থাকলে Antiviral ওষুধ
- পেটে পানি জমলে মূত্রবর্ধক ওষুধ
- রক্তনালী ফুলে গেলে Endoscopic চিকিৎসা
- Hepatic Encephalopathy হলে বিশেষ ওষুধ ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ
- শেষ পর্যায়ে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট
জীবনযাপনে করণীয়
- সম্পূর্ণ মদ্যপান বন্ধ করুন — সিরোসিস রোগীদের জন্য এটি অপরিহার্য
- লবণ কম খান — পেটে পানি জমা কমাতে সাহায্য করে
- প্রোটিনযুক্ত খাবার খান — ডাল, মাছ, ডিম পরিমিত পরিমাণে
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না — এমনকি প্যারাসিটামলও না
- নিয়মিত ফলো-আপ করুন — প্রতি ৩ থেকে ৬ মাসে লিভার পরীক্ষা করুন
- ভ্যাকসিন নিন — হেপাটাইটিস এ ও বি ভ্যাকসিন নিন যদি না নেওয়া থাকে
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:
- চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেছে
- পেট বা পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেছে
- আলট্রাসাউন্ডে লিভার সিরোসিসের লক্ষণ পাওয়া গেছে
- দীর্ঘদিন ধরে হেপাটাইটিস বি বা সি আছে
- রক্ত বমি বা কালো পায়খানা হচ্ছে — এটি জরুরি অবস্থা
লিভার সিরোসিস একটি গুরুতর রোগ, কিন্তু সঠিক সময়ে ধরা পড়লে এবং নিয়মিত চিকিৎসা নিলে দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। আপনার বা পরিবারের কারো লিভার সিরোসিসের লক্ষণ দেখা দিলে ডা. দেবপ্রসাদ অধিকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।