Dr Debprosad Adhikary

লিভার সিরোসিস — লক্ষণ, কারণ ও করণীয়

Liver cirrhosis awareness

লিভার সিরোসিস একটি মারাত্মক রোগ যেখানে লিভারের সুস্থ কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শক্ত আঁশযুক্ত টিস্যুতে পরিণত হয়। এই রোগ একবার হলে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয় — তবে সঠিক সময়ে ধরা পড়লে এবং নিয়মিত চিকিৎসা নিলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।

লিভার সিরোসিস কী?

লিভার সিরোসিস হলো লিভারের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির চূড়ান্ত পরিণতি। যখন লিভার বারবার আঘাত পায় — যেমন হেপাটাইটিস, ফ্যাটি লিভার বা অন্য কোনো কারণে — তখন লিভার নিজেকে মেরামত করতে গিয়ে আঁশযুক্ত টিস্যু তৈরি করে। এই আঁশ জমতে জমতে একসময় লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।

লিভার আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ — রক্ত পরিশোধন, হজম, রোগ প্রতিরোধ সহ ৫০০-এরও বেশি কাজ করে। তাই লিভার সিরোসিস হলে সারা শরীরে এর প্রভাব পড়ে।

লিভার সিরোসিস কেন হয়?

বাংলাদেশে লিভার সিরোসিসের প্রধান কারণগুলো হলো:

  • দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ — বাংলাদেশে এটিই সবচেয়ে বড় কারণ
  • দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস সি সংক্রমণ
  • নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা NAFLD
  • দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত মদ্যপান
  • অটোইমিউন হেপাটাইটিস
  • দীর্ঘমেয়াদী কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

লিভার সিরোসিসের লক্ষণ কী কী?

লিভার সিরোসিসের লক্ষণ দুটি পর্যায়ে দেখা যায়।

প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণ

এই পর্যায়ে লক্ষণ খুব কম থাকে তাই অনেকে বুঝতে পারেন না:

  • সহজেই ক্লান্তি আসা ও দুর্বলতা অনুভব করা
  • খাবারে অরুচি ও ওজন কমে যাওয়া
  • পেটের ডান দিকে উপরে হালকা অস্বস্তি
  • বমি বমি ভাব
  • রক্ত পরীক্ষায় লিভার এনজাইম বেশি আসা

উন্নত পর্যায়ের লক্ষণ

রোগ বাড়লে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়:

  • জন্ডিস — চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
  • পেট ফুলে যাওয়া — পেটে পানি জমা বা Ascites
  • পা ও পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া
  • রক্ত বমি বা কালো পায়খানা — এটি জরুরি অবস্থা
  • চামড়ায় চুলকানি
  • হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া
  • পুরুষদের বুকে স্তন বড় হয়ে যাওয়া
  • মানসিক বিভ্রান্তি ও ঘুমের সমস্যা — এটি Hepatic Encephalopathy এর লক্ষণ

সতর্ক সংকেত: রক্ত বমি, কালো পায়খানা বা হঠাৎ মানসিক বিভ্রান্তি হলে এটি জরুরি অবস্থা — সাথে সাথে হাসপাতালে যান।

লিভার সিরোসিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

লিভার সিরোসিস নির্ণয়ের জন্য নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়:

  • লিভার ফাংশন টেস্ট বা LFT — লিভারের কার্যক্ষমতা যাচাই
  • আলট্রাসাউন্ড — লিভারের আকার ও গঠন দেখা
  • Fibroscan — লিভারে কতটা আঁশ জমেছে তা পরিমাপ
  • Endoscopy — পাকস্থলী ও খাদ্যনালীতে রক্তনালী ফুলে আছে কিনা দেখা
  • লিভার বায়োপসি — নিশ্চিত নির্ণয়ের জন্য

লিভার সিরোসিসের চিকিৎসা ও করণীয়

লিভার সিরোসিস সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়, তবে সঠিক চিকিৎসায় রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

চিকিৎসা

  • কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা — হেপাটাইটিস বি থাকলে Antiviral ওষুধ
  • পেটে পানি জমলে মূত্রবর্ধক ওষুধ
  • রক্তনালী ফুলে গেলে Endoscopic চিকিৎসা
  • Hepatic Encephalopathy হলে বিশেষ ওষুধ ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ
  • শেষ পর্যায়ে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট

জীবনযাপনে করণীয়

  1. সম্পূর্ণ মদ্যপান বন্ধ করুন — সিরোসিস রোগীদের জন্য এটি অপরিহার্য
  2. লবণ কম খান — পেটে পানি জমা কমাতে সাহায্য করে
  3. প্রোটিনযুক্ত খাবার খান — ডাল, মাছ, ডিম পরিমিত পরিমাণে
  4. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না — এমনকি প্যারাসিটামলও না
  5. নিয়মিত ফলো-আপ করুন — প্রতি ৩ থেকে ৬ মাসে লিভার পরীক্ষা করুন
  6. ভ্যাকসিন নিন — হেপাটাইটিস এ ও বি ভ্যাকসিন নিন যদি না নেওয়া থাকে

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:

  • চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেছে
  • পেট বা পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেছে
  • আলট্রাসাউন্ডে লিভার সিরোসিসের লক্ষণ পাওয়া গেছে
  • দীর্ঘদিন ধরে হেপাটাইটিস বি বা সি আছে
  • রক্ত বমি বা কালো পায়খানা হচ্ছে — এটি জরুরি অবস্থা

লিভার সিরোসিস একটি গুরুতর রোগ, কিন্তু সঠিক সময়ে ধরা পড়লে এবং নিয়মিত চিকিৎসা নিলে দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। আপনার বা পরিবারের কারো লিভার সিরোসিসের লক্ষণ দেখা দিলে ডা. দেবপ্রসাদ অধিকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top