
হেপাটাইটিস বি বাংলাদেশে একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা। দেশের প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত — অথচ বেশিরভাগই জানেন না। এই ভাইরাস নীরবে লিভারের ক্ষতি করতে থাকে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সার হতে পারে।
হেপাটাইটিস বি কী?
হেপাটাইটিস বি হলো একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা লিভারকে আক্রমণ করে। HBV বা Hepatitis B Virus এর কারণে এই রোগ হয়। এই ভাইরাস লিভারের কোষ ধ্বংস করে এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
হেপাটাইটিস বি দুই ধরনের — তীব্র বা Acute এবং দীর্ঘমেয়াদী বা Chronic। বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক রোগী তীব্র সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠেন। কিন্তু যাদের ৬ মাসের বেশি সময় ধরে ভাইরাস থাকে তাদের Chronic হেপাটাইটিস বি হয়, যা সবচেয়ে বিপজ্জনক।
হেপাটাইটিস বি কীভাবে ছড়ায়?
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। প্রধান কারণগুলো হলো:
- আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে নবজাতক শিশুর মধ্যে — এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে সাধারণ কারণ
- আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত শরীরে প্রবেশ করলে
- একই সুই বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে
- অনিরাপদ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে
- আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত রেজার, টুথব্রাশ বা নেইল কাটার ব্যবহার করলে
- অপরিষ্কার যন্ত্রপাতি দিয়ে ট্যাটু বা কান ফোঁড়ানো
গুরুত্বপূর্ণ: হেপাটাইটিস বি একসাথে খাওয়া, কাশি, হাঁচি বা স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে এড়িয়ে চলা একদম ঠিক নয়।
হেপাটাইটিস বি এর লক্ষণ কী কী?
হেপাটাইটিস বি এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে লক্ষণ দেখা দিলে যা হতে পারে:
- চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস
- গাঢ় হলুদ রঙের প্রস্রাব
- পেটের ডান দিকে উপরে ব্যথা বা অস্বস্তি
- অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
- বমি বমি ভাব ও খাবারে অরুচি
- জ্বর ও মাথাব্যথা
- গিরায় গিরায় ব্যথা
সতর্ক সংকেত: উপরের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে অবিলম্বে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের কাছে যান।
হেপাটাইটিস বি কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
হেপাটাইটিস বি নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়। প্রধান পরীক্ষাগুলো হলো:
- HBsAg পরীক্ষা — এটি পজিটিভ হলে হেপাটাইটিস বি আছে বলে ধরা হয়
- HBeAg পরীক্ষা — ভাইরাস কতটা সক্রিয় তা জানা যায়
- HBV DNA পরীক্ষা — রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ জানা যায়
- লিভার ফাংশন টেস্ট বা LFT — লিভার কতটা ক্ষতিগ্রস্ত তা বোঝা যায়
- আলট্রাসাউন্ড — লিভারের অবস্থা দেখা যায়
হেপাটাইটিস বি এর চিকিৎসা কী?
তীব্র বা Acute হেপাটাইটিস বি সাধারণত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবারেই সেরে যায়। তবে Chronic হেপাটাইটিস বি এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দরকার।
বর্তমানে Chronic হেপাটাইটিস বি এর জন্য Antiviral ওষুধ পাওয়া যায় যা ভাইরাসের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে এবং লিভারের ক্ষতি কমায়। তবে এই চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিতে হবে।
হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের উপায়
সুখবর হলো হেপাটাইটিস বি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা নেওয়া।
- টিকা নিন — হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন ৯৫% কার্যকর। ৩টি ডোজে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া যায়। নবজাতককে অবশ্যই জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম ডোজ দিন
- রক্ত পরীক্ষা করুন — HBsAg পরীক্ষা করে জানুন আপনার হেপাটাইটিস বি আছে কিনা
- নিরাপদ সুই ব্যবহার করুন — একই সুই বা সিরিঞ্জ কখনো একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করবেন না
- ব্যক্তিগত জিনিস আলাদা রাখুন — রেজার, টুথব্রাশ অন্যের সাথে শেয়ার করবেন না
- নিয়মিত চেকআপ করুন — হেপাটাইটিস বি থাকলে প্রতি ৬ মাসে লিভার পরীক্ষা করুন
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে দেরি না করে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:
- HBsAg পরীক্ষায় পজিটিভ এসেছে
- চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেছে
- পরিবারের কেউ হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত
- দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করছেন
- লিভার ফাংশন টেস্টে অস্বাভাবিক ফলাফল এসেছে
হেপাটাইটিস বি একটি গুরুতর রোগ, কিন্তু সঠিক সময়ে ধরা পড়লে এবং নিয়মিত চিকিৎসা নিলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। আপনার বা পরিবারের কারো হেপাটাইটিস বি এর লক্ষণ দেখা দিলে বা পরীক্ষা করাতে চাইলে ডা. দেবপ্রসাদ অধিকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।