
বাংলাদেশে “গ্যাস্ট্রিক” শব্দটি এতটাই পরিচিত যে পেটে যেকোনো সমস্যা হলেই মানুষ বলেন “গ্যাস্ট্রিক হয়েছে।” কিন্তু গ্যাস্ট্রিক সম্পর্কে আমাদের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা আছে যা সঠিক চিকিৎসা পেতে বাধা দেয়। আজকের লেখায় গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি সম্পর্কে সব ভুল ধারণা দূর করব এবং সঠিক চিকিৎসার পথ দেখাব।
গ্যাস্ট্রিক আসলে কী?
আমরা যাকে “গ্যাস্ট্রিক” বলি তা আসলে Acid Reflux বা GERD — Gastroesophageal Reflux Disease। পাকস্থলীতে স্বাভাবিকভাবেই অ্যাসিড তৈরি হয় যা খাবার হজমে সাহায্য করে। কিন্তু যখন এই অ্যাসিড খাদ্যনালীতে উঠে আসে তখন বুকে জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুর ও অস্বস্তি হয় — এটিই গ্যাস্ট্রিকের মূল সমস্যা।
গ্যাস্ট্রিক সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো
ভুল ধারণা ১: গ্যাস্ট্রিক মানেই পেটে গ্যাস
অনেকে মনে করেন গ্যাস্ট্রিক মানে পেটে গ্যাস জমা। কিন্তু আসলে গ্যাস্ট্রিকের মূল সমস্যা হলো পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিড। পেটে গ্যাস জমা আলাদা সমস্যা যাকে Bloating বলা হয়।
ভুল ধারণা ২: খালি পেটে থাকলে গ্যাস্ট্রিক ভালো হয়
এটি সম্পূর্ণ ভুল। খালি পেটে থাকলে পাকস্থলীর অ্যাসিড আরও বেশি ক্ষতি করে। বরং নিয়মিত সময়মতো খাবার খেলে অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ভুল ধারণা ৩: গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সারাজীবন খেতে হবে
অনেকে মনে করেন একবার গ্যাস্ট্রিক হলে সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে। কিন্তু সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাপন পরিবর্তনে গ্যাস্ট্রিক সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ভুল ধারণা ৪: দুধ খেলে গ্যাস্ট্রিক ভালো হয়
অনেকে গ্যাস্ট্রিকে দুধ খান। কিন্তু দুধ প্রাথমিকভাবে আরাম দিলেও পরে আরও বেশি অ্যাসিড তৈরি করে। তাই গ্যাস্ট্রিকে দুধ খাওয়া উচিত নয়।
ভুল ধারণা ৫: গ্যাস্ট্রিক কোনো বড় সমস্যা নয়
দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসা না করলে খাদ্যনালীতে ক্ষত হতে পারে এবং পরে Barrett’s Esophagus বা এমনকি খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই গ্যাস্ট্রিককে অবহেলা করা উচিত নয়।
গ্যাস্ট্রিকের লক্ষণ কী কী?
- খাবার খাওয়ার পর বুকে বা পেটে জ্বালাপোড়া
- টক ঢেকুর আসা
- গলায় টক বা তেতো স্বাদ অনুভব করা
- রাতে শুয়ে পড়লে বুকজ্বালা বাড়া
- খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া
- বারবার কাশি বা গলা খুসখুস করা
- পেটের উপরের অংশে ব্যথা
গ্যাস্ট্রিকের কারণ কী?
- অনিয়মিত খাবার খাওয়া বা দীর্ঘসময় খালি পেটে থাকা
- অতিরিক্ত চা, কফি ও কোমল পানীয় পান করা
- ঝাল, তেল ও মশলাদার খাবার বেশি খাওয়া
- খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া
- অতিরিক্ত ওজন
- ধূমপান
- মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধ খাওয়া
- H. pylori ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
গ্যাস্ট্রিকের সঠিক চিকিৎসা
জীবনযাপন পরিবর্তন
- নিয়মিত সময়মতো খাবার খান — দীর্ঘসময় খালি পেটে থাকবেন না
- রাতের খাবার ঘুমানোর কমপক্ষে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে খান
- খাবার খাওয়ার পর সাথে সাথে শুবেন না
- ঘুমানোর সময় মাথা একটু উঁচু রাখুন
- ধীরে ধীরে চিবিয়ে খান
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- ধূমপান বন্ধ করুন
যা এড়াবেন
- অতিরিক্ত চা ও কফি
- কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংক
- অতিরিক্ত ঝাল ও তেলযুক্ত খাবার
- চকলেট ও পুদিনা — এগুলো অ্যাসিড রিফ্লাক্স বাড়ায়
- খালি পেটে ব্যথার ওষুধ
চিকিৎসা
গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসায় সাধারণত Proton Pump Inhibitor বা PPI জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয় যা পাকস্থলীর অ্যাসিড উৎপাদন কমায়। H. pylori ব্যাকটেরিয়া থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
তবে মনে রাখবেন — নিজে নিজে ওষুধ খাবেন না। কারণ দীর্ঘদিন একই ওষুধ খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং আসল সমস্যা ধরা নাও পড়তে পারে।
কখন এন্ডোস্কোপি করাবেন?
নিচের লক্ষণ থাকলে এন্ডোস্কোপি করানো জরুরি:
- দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাচ্ছেন কিন্তু ভালো হচ্ছে না
- খাবার গিলতে কষ্ট হচ্ছে
- রক্ত বমি বা কালো পায়খানা হচ্ছে
- অকারণে ওজন কমে যাচ্ছে
- ৪০ বছরের বেশি বয়সে নতুন করে গ্যাস্ট্রিক শুরু হয়েছে
গ্যাস্ট্রিককে অবহেলা নয় — সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিন। দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগলে বা ওষুধে ভালো না হলে ডা. দেবপ্রসাদ অধিকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।