Dr Debprosad Adhikary

ফ্যাটি লিভার কী, কেন হয় এবং কীভাবে প্রতিরোধ করবেন

Fatty liver awareness

ফ্যাটি লিভার কী

ফ্যাটি লিভার বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি ৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জনের ফ্যাটি লিভার আছে — অথচ বেশিরভাগ মানুষ জানেনই না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত। কারণ ফ্যাটি লিভার কোনো ব্যথা বা সতর্কতা ছাড়াই নীরবে ক্ষতি করতে থাকে।

ফ্যাটি লিভার হলো এমন একটি অবস্থা যখন লিভারের কোষে অস্বাভাবিক পরিমাণে চর্বি জমে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, লিভারের মোট ওজনের ৫%-এর বেশি চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়।

ফ্যাটি লিভার দুই ধরনের। প্রথমটি অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার, যা মদ্যপানের কারণে হয়। দ্বিতীয়টি নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার বা NAFLD(বর্তমানে MAFLD), যা মদ না খেয়েও হতে পারে। বাংলাদেশে NAFLD-ই বেশি দেখা যায়। তাই “আমি তো মদ খাই না, আমার হবে না” — এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

ফ্যাটি লিভার কেন হয়?

ফ্যাটি লিভারের পেছনে বেশ কিছু কারণ দায়ী। সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হলো:

  • অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস — ভাজাপোড়া, ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে লিভারে চর্বি জমে
  • শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা — সারাদিন বসে থাকা এবং ব্যায়াম না করলে শরীরের চর্বি পোড়ে না
  • ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স — রক্তে শর্করার সমস্যা থাকলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ে
  • অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা — বিশেষত পেটে চর্বি জমলে লিভারে প্রভাব পড়ে
  • দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ সেবন — ব্যথার ওষুধ ও স্টেরয়েড লিভারে প্রভাব ফেলতে পারে
  • বংশগত কারণ — পরিবারে কারো ফ্যাটি লিভার থাকলে অন্যদের ঝুঁকি বেশি

ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ কী কী?

ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে রোগ বাড়তে থাকলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:

  • পেটের ডান দিকে উপরে হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি
  • সহজেই ক্লান্তি আসা এবং দুর্বল লাগা
  • খাবারের পর পেট ভার লাগা
  • হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বিশেষত পেটে
  • বমি বমি ভাব ও হজমের সমস্যা
  • রক্ত পরীক্ষায় SGPT বা SGOT বেশি আসা

সতর্ক সংকেত: চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে গেলে, পেট বা পা ফুলে গেলে দেরি না করে অবিলম্বে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের কাছে যান। এগুলো সিরোসিসের লক্ষণ হতে পারে।

ফ্যাটি লিভারে কী খাবেন এবং কী এড়াবেন?

যা খাবেন

  • প্রচুর শাকসবজি ও তাজা ফলমূল
  • মাছ বিশেষত তৈলাক্ত মাছ যেমন ইলিশ ও রুই
  • লাল চাল ও লাল আটার রুটি
  • প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি
  • ডাল ও বাদাম পরিমিত পরিমাণে
  • ব্ল্যাক কফি যা গবেষণায় লিভারের জন্য উপকারী বলে প্রমাণিত

যা এড়াবেন

  • ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুড
  • অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার
  • সাদা চাল ও ময়দার তৈরি খাবার
  • কোমল পানীয় ও বোতলজাত জুস
  • প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার

ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধের উপায়

সুখবর হলো ফ্যাটি লিভার সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে শুধু জীবনযাপন পরিবর্তনেই সেরে যায়, কোনো ওষুধ ছাড়াই।

  1. প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটুন — সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন নিয়মিত হাঁটলে লিভারের চর্বি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে
  2. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন — মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমালেই লিভারে উন্নতি হয়
  3. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন — নিয়মিত রক্তের শর্করা পরীক্ষা করুন
  4. বছরে একবার চেকআপ করান — আলট্রাসাউন্ড ও লিভার ফাংশন টেস্ট করুন
  5. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না — অনেক সাধারণ ওষুধ বেশি পরিমাণে লিভারের ক্ষতি করে

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন:

  • রক্ত পরীক্ষায় SGPT বা SGOT বারবার বেশি আসছে
  • আলট্রাসাউন্ডে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়েছে
  • পেটের ডান দিকে ব্যথা বা অস্বস্তি দীর্ঘদিন ধরে আছে
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করছেন

ফ্যাটি লিভার একটি নীরব রোগ হলেও সচেতনতা ও সঠিক জীবনযাপনে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আপনার বা পরিবারের কারো ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ দেখা দিলে ডা. দেবপ্রসাদ অধিকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top